বৈশ্বিক কর ব্যবস্থায় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কর ফাঁকি ও মুনাফা স্থানান্তর ঠেকাতে ২০২১ সালে গৃহীত হয় বৈশ্বিক ন্যূনতম করপোরেট কর কাঠামো (গ্লোবাল মিনিমাম করপোরেট ট্যাক্স এগ্রিমেন্ট)। এর আওতায় বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কর ধরা হয়েছে ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবসা চালানো দেশগুলোয় অন্তত এ হারে কর পরিশোধ করতে হবে কোম্পানিগুলোকে। অন্যথায় এ কর পরিশোধ করতে হবে অন্য কোনো দেশে। তবে এ ১৫ শতাংশ ন্যূনতম করের বাধ্যবাধকতার বাইরে থাকছে মার্কিন বহুজাতিকগুলো। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আপত্তির মুখে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ছাড় দিয়েই চুক্তিটি সংশোধন করেছে অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি)। খবর রয়টার্স ও এপি।
সংশোধনটিকে বৈষম্যমূলক বলছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শুল্ক ব্যবস্থার বিশ্লেষকরা। তাদের ভাষ্যমতে, মার্কিন আপত্তির প্রেক্ষাপটে দেশটির বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কার্যত বৈশ্বিক করের বাইরে থাকছে। এতে ‘করস্বর্গ’ হিসেবে পরিচিত অঞ্চলে মার্কিন করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর পুঁজি স্থানান্তরের মাত্রা আরো বাড়বে।
ওইসিডির নেতৃত্বে প্রায় ১৫০টি দেশ গত সোমবার চুক্তিটি হালনাগাদ করতে সম্মত হয়। নতুন এ প্যাকেজে ১৫ শতাংশ বৈশ্বিক ন্যূনতম কর কাঠামো বহাল রাখা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো বৃহৎ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিশ্বের যেখানেই কার্যক্রম পরিচালনা করুক, সেখানে অন্তত একটি ন্যূনতম কর পরিশোধ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে কম করের দেশে বড় কোম্পানিগুলোর কৃত্রিমভাবে মুনাফা ও পুঁজি স্থানান্তরের প্রবণতাকে ঠেকানো।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যূনতম কর আইনগুলোর সঙ্গে বৈশ্বিক মানদণ্ডের সামঞ্জস্য আনতে সংশোধিত কাঠামোয় সরলীকরণ ও বিশেষ ছাড় যুক্ত করা হয়েছে। দেশটি দাবি করে আসছিল, বৈশ্বিক ন্যূনতম কর নিয়মের ফলে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অন্যায্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এখন চুক্তির শর্ত পরিবর্তন মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন দেশে কর-সুবিধার দাবিগুলোকে জোরদার করেছে। এতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কর সংস্কারের ভবিষ্যৎ ও কর স্বচ্ছতার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে মার্কিন বহুজাতিকগুলোর করস্বর্গ ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
২০২১ সালের মূল চুক্তির লক্ষ্য ছিল অ্যাপল, নাইকির মতো কোম্পানিগুলোকে হিসাবনিকাশ ও আইনি কৌশলের মাধ্যমে বারমুডা বা কেম্যান দ্বীপপুঞ্জের মতো কর স্বর্গে মুনাফা স্থানান্তর থেকে বিরত রাখা। কারণ এসব অঞ্চলে কোম্পানিগুলো আদতে কোনো ব্যবসাই করে না বা করলেও তা একেবারেই যৎসামান্য।
যদিও ওইসিডির প্রধান ম্যাথিয়াস করমান দাবি করছেন, আন্তর্জাতিক কর সহযোগিতার ক্ষেত্রে চুক্তিটি যুগান্তকারী। তিনি বলেন, ‘এ সমঝোতা কর আহরণের নিশ্চয়তা বাড়াবে, জটিলতা কমাবে এবং দেশগুলোর করভিত্তি সুরক্ষিত করবে।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর এক নির্বাহী আদেশে ঘোষণা করেছিলেন, ওইসিডির বৈশ্বিক ন্যূনতম কর চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট গত সোমবার বলেন, ‘নতুন এ চুক্তির ফলে মার্কিন কোম্পানিগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত বৈশ্বিক ন্যূনতম করের আওতায়ই থাকবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা ও বিনিয়োগ কর ছাড়ের সুবিধাগুলোও অক্ষুণ্ন থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘এ চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কর-সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা এবং মার্কিন কর্মী ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে অন্য দেশের কর আগ্রাসন থেকে সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক বিজয়।’
ওইসিডি চুক্তির দ্বিতীয় ও সবচেয়ে জটিল স্তম্ভ ডিজিটাল অর্থনীতির কর কাঠামো। এ বিষয়ে অন্যান্য দেশের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র যুক্ত থাকবে বলেও জানান স্কট বেসেন্ট।
গত অক্টোবর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের বৈশ্বিক কর চুক্তি বাস্তবায়ন শুরু করেছে ৬৫টির বেশি দেশ। ওই চুক্তি অনুযায়ী, যদি কোনো দেশ ১৫ শতাংশ ন্যূনতম কর না নেয়, তাহলে ওই দেশে মুনাফা দেখানো বড় কোম্পানিগুলোকে অন্য কোনো দেশে অতিরিক্ত কর দিতে হবে।
কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, বাইডেন প্রশাসনের সময় সম্মত হওয়া ২০২১ সালের চুক্তিটির শর্তগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তার এমন বক্তব্য বৈশ্বিক কর উদ্যোগের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। এরপর ট্রাম্প প্রশাসন হুমকি দেয়, যেসব দেশ ২০২১ সালের চুক্তির আওতায় মার্কিন কোম্পানির ওপর কর আরোপ করবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক কর চালু হবে।
২০২১ সালের চুক্তি সমর্থন করেছিলেন তৎকালীন মার্কিন অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন। ওই সময় উদ্যোগটির তীব্র সমালোচনা করে মার্কিন কংগ্রেসের রিপাবলিকানরা দাবি করেছিলেন, এটি বাস্তবায়ন হলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র।
ন্যূনতম কর চুক্তি নিয়ে গত জুনে নতুন করে দরকষাকষি শুরু করে ট্রাম্প প্রশাসন। ওই সময় রিপাবলিকানরা কর-বাজেটসংক্রান্ত একটি বড় পরিকল্পনা থেকে তথাকথিত প্রতিশোধমূলক কর ধারা (রিভেঞ্জ ট্যাক্স প্রভিশন) বাতিল করে। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদেশী মালিকানাধীন কোম্পানি ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ‘অন্যায্য কর’ আরোপকারী দেশের বিনিয়োগকারীদের ওপর কর বসানোর প্রস্তাব ছিল।
কর–স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন এ বৈশ্বিক ন্যূনতম করপোরেট কর চুক্তি সংশোধনের কড়া সমালোচনা করেছে। এফএসিটি কোয়ালিশনের নীতিবিষয়ক পরিচালক জোরকা মিলিন বলেন, ‘কর সংস্কারে প্রায় এক দশকে যে বৈশ্বিক অগ্রগতি হয়েছে, এ চুক্তির সংশোধন তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও মুনাফা করা মার্কিন কোম্পানিগুলোকে কর স্বর্গে মুনাফা লুকিয়ে রাখার সুযোগ দিচ্ছে এটি।’
সমালোচকদের মতে, বৈশ্বিক ন্যূনতম কর চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল করপোরেট করহার কমানোর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বন্ধ করা। কারণ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কম করের দেশেই বেশি মুনাফা দেখিয়ে থাকে। এখন সংশোধিত চুক্তি সে সুযোগকে আরো অবারিত করে দিয়েছে।